• বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ০৪:৩৫ পূর্বাহ্ন
  • Bengali Bengali English English

সাময়িক শ্রমিক – একটি আইনগত বিশ্লেষণ (ধারাবাহিক পর্বের- ৫ম পর্ব)

rmgnews24
আপডেট: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সাময়িক শ্রমিক – একটি আইনগত বিশ্লেষণ
(বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ ও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুসরনে)

মোহাম্মদ বাবর চৌধুরী

এই পর্বে সহযোগিতায়ঃ
মোঃ ইমরুল হাসান
এবং মোঃ আফজাল হোসেন রানা

সাময়িক শ্রমিক- একটি আইনগত বিশ্লেষণ
প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় অস্থায়ী শ্রমিক এবং সাময়িক শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য বের করতে পারি না। ইতিপুর্বে আমি অত্র সিরিজের চতুর্থ পর্বে অস্থায়ী শ্রমিকের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। অস্থায়ী শ্রমিকের পর্বটি যারা পড়েছেন তাদের অনেকে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন সাময়িক শ্রমিক এবং অস্থায়ী শ্রমিকের মধ্যে তফাৎ কি? এছাড়া সাময়িক শ্রমিক আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত নিয়োগ দিয়ে আমরা বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করে থাকি। তাই সাময়িক শ্রমিক সম্পর্কে আমাদের জানা অত্যাবশ্যক এবং বিষয়টি ইতিপূর্বে আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক বিধায় এই পর্বে সাময়িক শ্রমিক নিয়ো আলোচনা করা হল।

অত্র পর্বে সাময়িক শ্রমিক সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা দিতে আমি আমার একটি গবেষনা পত্রের নির্বাচিত কিছু অংশ নিম্নে তুলে ধরলামঃ

গবেষনা পত্রঃ কর্মী নিয়োগ ও নিয়োগ পত্র (নির্বাচিত অংশ)
প্রকাশকঃ বাবর এন্ড এসোসিয়েটস্

কর্মীর শ্রেনী বিন্যাস করন সূত্রঃ “কর্ম হইতে কর্মীর উৎপত্তি”
প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের সময় সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরন করে সঠিক শ্রেণীর কর্মী নিয়োগ করতে হয়। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রম আইন এবং উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ গুলো পর্যালোচনায় দেখা যায় সকল নিয়োগ এবং নিয়োগকৃত কর্মীদের শ্রেণী বিন্যাস কর্মকে ভিত্তি ধরে করা হয়েছে। তাই আমি কর্মীর শ্রেনী বিন্যাস নির্ধারণে কর্মকে ভিত্তি ধরে একটি সূত্র নির্ধারণ করেছি, সূত্রটি কর্মী নিয়োগের সময় বা কর্মরত কর্মীর শ্রেণী নির্নয়ে মনে রাখতে হবে এবং উক্ত সূত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজতে হবে।সূত্রটি যদি আমরা যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্ম সম্পাদনে সঠিক শ্রেণীর কর্মী নিয়োগ দিতে এবং কর্মরত কর্মীদের সঠিক শ্রেণী নির্নয় করতে পারব। আমার নির্ধারিত সূত্রটি হচ্ছে “কর্ম হইতে কর্মীর উৎপত্তি “। এই উক্তিটি আমাদের সাময়িক শ্রমিক নিয়োগে এবং তার কার্য নির্ধারনের ক্ষেত্রে সূত্র হিসাবে মনে রাখতে হবে এবং ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে হবে।

নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদেরকে দেখতে হবে কি ধরনের কার্য সম্পাদনের জন্য প্রতিষ্ঠানে সাময়িক শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হবে। প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কর্মটি সাময়িক ধরনের কিনা? পূর্ব ধারনা ব্যতীত হটাৎ করে এধরনের কর্মের উৎপত্তি কিনা? এধরণের আরো অনেক বিষয়ের উত্তর খুঁজতে হবে। নিন্মে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুসারে সাময়িক শ্রমিকের কাজ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বিষদ তুলে ধরা হল।

সাময়িক কাজঃ
প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় অনেক সময় এমন কিছু কাজ হয়, যে সব কাজ ঘটনাচক্রে বা দৈবক্রমে অথবা আকস্মিকভাবে ঘটে যায়, এসব কাজকে সাময়িক কাজ বলে। সাময়িক শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্ট বলেছেন,”যে কোন আশা- আকাংখা যাহা কোন কোন ক্ষেত্রে হঠাৎ করিয়া হয়ে যায় এবং যাহা বর্ণনাতীত তাহাকে দৈবাৎ বা সাময়িক সংগঠিত ঘটনা বলা হয়।”
প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় সাময়িক কাজ পূর্ব থেকে অনুমান করা যায় না, এধরনের কাজ ঘটনাক্রমে ঘটে। এধরনের কাজের আগমন কখন হবে তা যেমন কেউ জানে না, তেমনি কেউ এধরনের কাজ সম্পর্কে পূর্ব অনুমান করতে পারে না। এধরনের কাজ মানুষের হিসাব বহির্ভূত এবং ভবিষ্যত অনিশ্চিত কোন ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট।
প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর শর্ত সাপেক্ষে ৪ ধারার অধীন শ্রেনী বিন্যাসকৃত শ্রমিকদের মধ্যে হতে সাময়িক কাজ সম্পাদনের জন্য সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। নিন্মে সাময়িক শ্রমিকের বিষয়টি বিশদ আলোচনা করা হলো।

 

সাময়িক শ্রমিক (Casual Worker):
কোন শ্রমিককে সাময়িক বলা হইবে যদি কোন প্রতিষ্ঠানে সাময়িক ধরনের কাজে সাময়িকভাবে তাহাকে নিয়োগ করা হয়। [বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ৪(৪)]

[ব্যাখ্যাঃ
কোন প্রতিষ্ঠানে বা ব্যবসায় সাময়িক কার্য সম্পাদনের জন্য কোন শ্রমিক নিয়োগ প্রদান করলে তাকে সাময়িক শ্রমিক বলে। প্রতিষ্ঠানে সাময়িক কার্য পূর্ব হতে অনুমান করা যায় না, এধরনের কার্য দৈবক্রমে ঘটে। এধরনের কাজের আগমন কখন হবে তা যেমন কেউ জানে না, তেমনি কেউ এধরনের কাজ সম্পর্কে পূর্ব অনুমানও করতে পারে না। এধরনের কাজ মানুষের হিসাব বহির্ভূত এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত কোন ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট। এধরনের নৈমিত্তিক (Casual) কার্য সম্পাদনের জন্য যে শ্রমিক নিয়োগ প্রদান করা হয় তাকে সাময়িক শ্রমিক বলে।

সাময়িক শ্রমিক কখনো স্থায়ী শ্রমিকের মত আইনের শর্ত সাপেক্ষে চাকুরী পরিসমাপ্তির সময় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ হতে কোন দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ -সুবিধা (চাকুরীর পরিসমাপ্তির পূর্বে নোটিশ বা নোটিশের পরিবর্তে পরিশোধ /ক্ষতিপূরন/গ্রাচুইটি/ভবিষ্যত তহবিল ইত্যাদি) এবং লে-অফ ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারে না।

সাময়িক শ্রমিকের ক্ষেত্রে সার্ভিস বহি প্রযোজ্য নয় ; তবে প্রত্যেক সাময়িক শ্রমিককে একটি সাময়িক কার্ড দেয়া হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক যে সমস্ত দিন কাজ করেছেন তা উল্লেখ থাকবে।

কোন সাময়িক শ্রমিককে যে পদে নিয়োগ দেয়া হবে উক্ত পদে সরকারের বা নূন্যতম মজুরী বোর্ডের কোন মজুরী নির্দেশনা না থাকলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের মজুরি প্রতিষ্ঠানের নীতি দ্বারা নির্ধারিত হবে।

উদাহরণঃ
কারখানায় হঠাৎ একটি পানির কল নষ্ট হয়ে গেল বা দৈবক্রমে কারখানার একটি দেওয়াল ফেটে গেল; এক্ষেত্রে উক্ত পানির কল মেরামতে ১ বা ২ ঘন্টার জন্য প্লাম্বার নিয়োগ বা কারখানার দেওয়ালটি মেরামতে ৪/৫ দিনের জন্য রাজমিস্ত্রি নিয়োগ দেয়া হল এবং উক্ত কাজ সম্পন্ন হলে রাজমিস্ত্রি বা প্লাম্বার নিয়োগের উদ্দেশ্য সম্পন্ন হয়ে যায় এবং চাকুরীর পরিসমাপ্তি ঘটে; এধরনের নৈমিত্তিক ঘটনায় সৃষ্ট কোন কার্য সম্পাদনে নিয়োগ প্রাপ্ত শ্রমিককে সাময়িক শ্রমিক বলে।

অস্থায়ী শ্রমিক ও সাময়িক শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্যঃ
অস্থায়ী শ্রমিক ও সাময়িক শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য হল সাময়িক শ্রমিক নৈমত্তিক (হটাৎ) ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ফলে সৃষ্ট কার্য সম্পাদন করেন। সাময়িক কার্য কখন সৃষ্টি হতে পারে তা পূর্ব হতে কোন অনুমান করা যায় না এবং এ ধরনের কাজের স্থায়িত্ব কালও ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির হয় পক্ষান্তের অস্থায়ী শ্রমিক হটাৎ সৃষ্ট নয়, পূর্ব পরিকল্পিত এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে এ ধরনের কার্য সম্পাদনে নিয়োগ প্রাপ্ত হন এবং উক্ত কাজের স্থায়ীত্বকাল পর্যন্ত উক্ত অস্থায়ী নিয়োগ অক্ষুন্ন থাকতে পারে।

 

ব্যতিক্রমঃ
সাময়িক শ্রমিকের কাজের সময় কাল নৈমিত্তিক কোন ঘটনায় সৃষ্ট কাজের সময় কালের সমান; যে কাজ খুবই অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। যদি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একজন সাময়িক শ্রমিক দিয়ে অল্প সময় ব্যপ্ত এমন কাজ না করিয়ে, কোন স্থায়ী কাজ একই সাথে বা তিন বৎসরের বিরতি দিয়ে দিয়ে ৯০ দিনের বেশী সময় করান তবে সংশ্লিষ্ট সাময়িক শ্রমিকটি স্থায়ী শ্রমিক বলে আইনত দাবী করে উক্ত দাবী আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।

সবাইকে ধন্যবাদ।


এই বিভাগের আরো খবর