• রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
  • Bengali Bengali English English
শিরোনাম

মহামারী এবং মালিক শ্রমিক করণীয়- একটি আইনগত বিশ্লেষণ (ধারাবাহিক পর্বের- ১ম পর্ব)

rmgnews24
আপডেট: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০

মহামারী এবং মালিক শ্রমিক করণীয়- একটি আইনগত বিশ্লেষণ (ধারাবাহিক পর্বের- ১ম পর্ব)

করোনা ভাইরাস (কোভিড- ১৯) মহামারী আকারে প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বব্যাপী থমকে দাড়িয়েছে জনজীবন, বন্ধ হয়েছে সকল অফিস আদালত ও কলকারখানাসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। আমাদের দেশেও করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবে অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে বা হয়ে যাচ্ছে। শিল্প কারখানা গুলোর ভবিষ্যত অস্তিত্ব ধরে রাখতে তাদের পুজি ধরে রাখার চিন্তা যেমন মালিক পক্ষের আইন সঙ্গত, তেমনি শ্রমিক পক্ষ মহামারী কালীন কাজ না করে ঘরে অবস্থান করে নিজের জীবন ধারণ এবং অস্তিত্ব রক্ষায় ন্যূনতম চাহিদা পূরনে প্রতিষ্ঠান তাদের পাশে থাকবে এমন চিন্তা করাটাও যৌক্তিক এবং আইন সঙ্গত।

আমাদের দেশে বর্তমান মহামারী প্রাদুর্ভাবের পর আমরা বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে গেছি এ ধরনের প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন সময় উৎপাদনের উপকরন হিসেবে শ্রমের প্রধান নিয়ামক শ্রমিক রক্ষায় মালিকের দায়িত্ব কি বা শ্রমিকের অধিকার কি। আমাদের শ্রম আইনে এমন প্রেক্ষাপটে মালিক ও শ্রমিকের স্বার্থ সংরক্ষণ করে যে নীতির কথা বলেছেন তা হল প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা এবং শ্রমিকদের জীবন ধারন ও ন্যূনতম চাহিদা পূরনে লে-অফ নীতি অনুসরণ করে তাদের মজুরীর পরিবর্তে ক্ষতিপূরন পরিশোধ করা। আমরা অনেক সময় কিছু শ্রমিক নেতাদের দেখি যারা জাতির এমন দুঃসময়ে অসংযত কথা বলে, কাজ না করে ঘরে বসে শ্রমিকদের সম্পূর্ণ মজুরী পরিশোধ দিতে বলে, পক্ষান্তরে কিছু মালিক পক্ষের লোকদের দেখা যায় শ্রমিক কাজ করবে না বিধায় কোন পরিশোধ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, অনেকে আবার অতি উৎসাহিত হয়ে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করা শ্রমিকদের এমন দুঃসময়ে ছাটাই করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জাতির এমন দুর্যোগের সময় এ ধরনের আচরণ বাঞ্চণীয় নয়। অতীতে জাতীয় দূর্যোগ আমরা বাংঙ্গালিরা যেমন সবাই সম্মিলিত মোকাবিলাভাবে করেছি তেমনি বর্তমান সময়ও আমাদের উচিত মালিক ও শ্রমিক একত্রিত হয়ে এ দূর্যোগ মোকাবিলা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে মালিক যদি দূর্যোগ মোকাবিলায় সকল পুঁজি হারায় তাহলে প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হবে, আর প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলে শ্রমিক হারাবে তার কর্মসংস্থান এবং জাতি হিসাবে আমরা হয়ে পড়ব আর্থিকভাবে দেওলিয়া পক্ষান্তরে শ্রমিক যদি দূর্যোগ মোকাবিলায় তার জীবন ও অস্তিত্ব হারায় তবে মালিকের পুঁজি থেকে লাভ কি? কারন পুঁজি থাকলেও শ্রমিক ছাড়া মালিকের প্রতিষ্ঠান অচল। তাই এমন অবস্থায় শ্রমিক মালিক সকলের স্বার্থে আইন বলছে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে আর মালিক শ্রমিককে লে-অফ নীতি অনুসরণ করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।

যদি একটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময় বন্ধ থাকে তবে, সেক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ হলো তার প্রক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের পাওনা কি হবে তা বাংলাদেশ শ্রম আইনে উল্লেখ আছে। আমরা জাতি হিসেবে মানবীয় সমাধান মানবীয় ভাবে না খুজে অতিমানবীয় ভাবে খুজি। এখানে মালিক পক্ষ বা শ্রমিক পক্ষ নিজেকে মানব হিসাবে না ভেবে অতিমানব হিসেবে চিন্তা করে আইনের মাঝে সমাধান না খুজে আইনের বাইরে গিয়ে অতিমানবীয় সমাধান খুজতে থাকি এবং উভয়পক্ষ বিভিন্ন অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধার কথা কল্পনা করতে থাকে। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এই প্রতিকূল পরিবেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনমান রক্ষা করে জীবন ধারন সহ একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে টিকে থাকবে এ সকল সমস্যার সমাধান আইনে না খোঁজে নিজেরা নিজেদের মন মত ব্যাখ্যা দিচ্ছি, যেখানে আইনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া দেওয়া আছে। এমন অবস্থায় যদি একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে তবে সেক্ষেত্রে বন্ধ থাকাবস্থায় প্রতিষ্ঠানের কি করণীয় তা সুস্পষ্ঠ ভাবে আইনে ব্যাখ্যা আছে এবং বন্ধকালীন সময় প্রতিষ্ঠান ঠিক আইনে যেভাবে বলা আছে সেভাবেই চলবে। বর্তমান প্রেক্ষাপট যেহেতু মহামারি সেহেতু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে এবং শ্রমিকগণ লে-অফ থাকবে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১২ ধারায়, শ্রমিকগণ ক্ষতিপূরণ পাবে ১৬ ধারায়। এ অবস্থায় যেমন শ্রমিকদের বেতন ভাতাসহ জীবন ধারণের কথা ভাবতে হবে ঠিক তেমনি অপরদিকে প্রতিষ্ঠানের পুজিসহ টিকে থাকার কথাও ভাবতে হবে। এই পরিস্থিতিতে শ্রম আইন বলছে লে-অফ করার জন্য। লে-অফের সময় সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে নির্ধারিত সময় এবং নির্দিষ্ট অনুপাতে মূল মজুরি ও বাড়িভাড়া পরিশোধের কথা বলা আছে। এখানে অনেকে বলছে যে এ অবস্থায় অন্যান্য সুবিধাসমূহ পাবে কি না? যেহেতু এটি একটি বিশেষ ব্যবস্থা সুতরাং এ অবস্থায় ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা সমূহ আইন অনুসারে পাবে না। লে-অফ কালিন সময়ে শুধুমাত্র দুইটি (মজুরি ও বাড়িভাড়া) বিষয়ের কথা আইনে বলা হয়েছে যাহা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে সুতরাং এখানে অন্যান্য সুবিধা সমূহ এ অবস্থায় বন্ধ থাকবে৷

আরেকটি বিষয় বলে রাখা দরকার যে অন্যান্য সুযোগ সুবিধা শুধুমাত্র একজন শ্রমিকের কর্মকালীন সময়ে অধিকারপ্রাপ্ত। লে-অফ থাকাবস্থায় অনেকে মতামত ব্যক্ত করেছেন যে শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা কমানো হচ্ছে। এটি একটি ভ্রান্ত ধারনা কারণ যেহেতু আইনে লে-অফ থাকা কালীন সময়ের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পরিশোধের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে সেখানে ভিন্ন রকম কথা বলার কোনো সুযোগ নাই। এক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান লে-অফ থাকা কালীন অবস্থায় উল্লেখিত ক্ষতিপূরণের কম প্রদান করে সেক্ষেত্রে এমন অভিযোগ যুক্তিযুক্ত।

যেখানে ঈদের সময় তিন দিনের জায়গায় পাঁচ দিন ছুটি দিলে বাকি ২ দিন কাজ করতে হয়, সেখানে এমন অবস্থায় মাসের পর মাস বসে থেকে মালিক পক্ষ সকল সুযোগ সুবিধা দিবে এটি কল্পনা করা বা ভাবাও কতটুকু যুক্তিযুক্ত সেটাও চিন্তার বিষয়। যেহেতু বর্তমানে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান সেহেতু শ্রমিকরাও যেন প্রতিষ্ঠান দ্বারা শোষিত না হয় বা তাদের ন্যায্য অধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয় সেটা খেয়াল রেখে অপরদিকে প্রতিষ্ঠানও যেন দীর্ঘ সময় পুঁজি নিয়ে টিকে থাকতে পারে সেটাও ভাবতে হবে। তাই আমরা উভয় পক্ষ নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে সংযত থেকে সকল সুযোগ সুবিধা আইন অনুসারে ন্যূনতম ভোগ করে এই কঠিন সময় পার করাই এখন আমাদের শপথ হওয়া উচিত।

প্রধান গবেষকঃ
মোহাম্মদ বাবর চৌধুরী
অ্যাডভোকেট এন্ড লীড কনসালটেন্ট, বাবর এন্ড এসোসিয়েটস এবং শ্রম আইন বিষয়ক গবেষক।

 

গবেষণা সহকারীঃ
মোঃ ইমরুল হাসান,
এইচ. আর প্রফেশনাল।


এই বিভাগের আরো খবর